বাংলাদেশের মুসলিম বিবাহ আইন

বিবাহ বা বিয়ে হল একটি সামাজিক বন্ধন বা আইনি চুক্তি যার মাধ্যমে দুই ব্যক্তির মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। যদিও বিয়ের সংজ্ঞা বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে পরিবর্তিত হয়, তবে সাধারণভাবে বিয়ে হল একটি বন্ধন, যার মাধ্যমে দুজন মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা এবং যৌন সম্পর্ক সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। বিস্তারিত সংজ্ঞার ভাষায়, বিবাহ একটি বৈশ্বিক সার্বজনীন। বিবাহ হল একটি বৈশ্বিক সার্বজনীন সংস্কৃতি।

বিবাহ সাধারণত কোন রাষ্ট্র, কোন সংস্থা, কোন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, কোন আদিবাসী গোষ্ঠী, কোন স্থানীয় সম্প্রদায় অথবা দলগত ব্যক্তিবর্গের দ্বারা স্বীকৃত হতে পারে। একে প্রায়শই একটি চুক্তি হিসেবে দেখা হয়। বিবাহ বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন উপায়ে সম্পাদিত হয়। বিবাহ একটি ধর্মীয় আচার হলেও আধুনিক সভ্যতায় এটি একটি আইনী রীতিও বটে। বিবাহবহির্ভূত যৌনতা একটি পাপ এবং একটি অপরাধ যা অবৈধ এবং ব্যভিচার বলে স্বীকৃত।

বাংলাদেশের মুসলিম বিবাহ আইন

বিবাহ একজন পুরুষ ও নারীর মধ্যে সামাজিক ও যৌনসম্পর্ক স্থাপনের ধর্মীয় রীতি। বিবাহের মাধ্যমে পরিবারের সূত্রপাত হয়। এছাড়া বিবাহের মাধ্যমে বংশবিস্তার ও উত্তরাধিকারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিবাহের মাধ্যমে পরস্পর সম্পর্কিত পুরুষকে স্বামী (পতি)এবং নারীকে স্ত্রী (পত্নী) হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। স্বামী ও স্ত্রীর যুক্ত জীবনকে “দাম্পত্য জীবন” হিসাবে অভিহিত করা হয়। বিভিন্ন ধর্মে বিবাহের বিভিন্ন রীতি প্রচলিত।

বাংলাদেশে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন কার্যক্রম সম্পাদিত হয়। এই শর্তানুসারে বরের বয়স কমপক্ষে ২১ এবং কনের বয়স কমপক্ষে ১৮ হওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া বর-কনেকে সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে। অতঃপর নারী ও পুরুষকে ইসলামী বিধান অনুসারে উভয়পক্ষের সাক্ষীর সামনে একজন উকিল বা কাজি’র উপস্থিতিতে সম্মতি জানাতে হয় দুজন সুস্থ মস্তিষ্কের প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক।

মুসলিম বিবাহ আইন:- ইসলাম ধর্মে বিবাহের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের মধ্যকার যৌন সম্পর্কের অনুমতি রয়েছে। ইসলামিক বিয়েতে বর ও কনে উভয়ের সম্মতি এবং বিয়ের সময় উভয় পক্ষের আইনগত অভিভাবক বা অভিভাবকের উপস্থিতি ও সম্মতি প্রয়োজন। বিয়ের আগে কনে পক্ষের পক্ষ থেকে কনের চাহিদা মোতাবেক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা সম্পত্তি দিতে হয়, একে দেনমোহর বলে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, একজন পুরুষ সকল স্ত্রীকে সমান অধিকার প্রদানের তার চাহিদা অনুসারে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করতে পারে। আর যদি সমান অধিকার দিতে অক্ষম হন তবে শুধুমাত্র একটি বিবাহের অনুমতি দেওয়া হবে। মেয়েদের জন্য একাধিক বিবাহ অনুমোদিত নয়। ইসলামে একজন মুসলিম একজন অমুসলিমকে বিয়ে করতে পারে যদি অমুসলিম বিশ্বাস করে (ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়)।

সম্মতিঃ বর – কনের স্বাধীন সম্মতি থাকতে হবে । অর্থাৎ সম্মতির কথাটি স্পষ্ট উচ্চারণে বলতে হবে । কাজী ও সাক্ষীগণ নিজ কানে সম্মতির বিষয়টি শুনবেন । অনেক ক্ষেত্রে কাজীর সহযোগিতায় জোর করে কনের সম্মতি নেওয়া হয় বা না নিয়েই নেওয়া হয়েছে বলে গণ্য করা হয় । এরকম পরিস্থিতিতে নারীটি পরবর্তীতে বিয়ে অস্বীকার করত বিয়ে বাতিলের জন্য সহকারী জজ আদালতে ঘোষণামূলক মামলা করতে পারেন ।

বিবাহের বয়সঃ ১৯২৯ সালের বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন অনুসারে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের বয়স ১৮ ও ছেলের বয়স ২১ হতে হবে । কাজী সাহেব বয়স পরীক্ষার জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদ বা এসএসসি সার্টিফিকেট বা ডাক্তারি সার্টিফিকেট দেখে সন্তুষ্ট হবেন । কোন অবস্থাতেই নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে কৃত বয়স প্রমাণের ঘোষণা গ্রহণযোগ্য হবেনা ।

বিবাহের সাক্ষীঃ  দুইজন সুস্থ মস্তিষ্কের প্রাপ্ত বয়স্ক সাক্ষী থাকতে হবে । একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে যে, একজন পুরুষ সাক্ষী সমান দুইজন নারী সাক্ষী । সাক্ষ্য আইনের বিধান মতে চুক্তির ক্ষেত্রে দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য যথেষ্ট । এ আইন অনুসারে নারী – পুরুষের সমান মর্যাদা । সেখানে নারী – পুরুষের কথা পৃথকভাবে বলা হয়নি । এমনকি কাবিননামার ফর্মেও কোথাও একজন পুরুষ সাক্ষীর বিপরীতে দুইজন নারী সাক্ষীর কথা বলা হয়নি । এছাড়া ‘ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ ’ বা ‘ মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯৭৪ ’ বা অন্য কোন আইনে ‘ একজন পুরুষ সমান দুইজন নারী সাক্ষী ’ – এরুপ কোনো বিধান নেই ।উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে যেহেতু মেয়েটি ছেলেটির অর্ধেক পায় সম্ভবতও সেখান থেকে এসেছে এই ধারণাটি । তো মূল বিষয় কমপক্ষে দুইজন সাক্ষী লাগবে । অবশ্য বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ অনুসারে ৩ জন সাক্ষী প্রয়োজন হয় ।

বিবাহের দেনমোহরঃ প্রতিটি মুসলিম বিয়েতে দেনমোহর থাকতে হবে । মোহরানা স্ত্রীর অধিকার । উদার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমাদের আর্থ – সামাজিক ব্যবস্থায় এই দেনমোহর সঙ্কটের কালে বেঁচে থাকার উৎস হিসেবে কাজ করে । আমাদের দেশের অধিকাংশ নারী নিরক্ষর বা স্বল্প শিক্ষিত । ঘর – গৃহস্থালির কাজ ছাড়া অন্যকোন কাজ তারা জানে না । এই নারী যখন বিধবা হয়ে যায় বা কোন কারণে বা কারণ ছাড়া তালাকপ্রাপ্ত হয় এবং ওই নারীর যদি দুই কূলে কেউ না থাকে বা থাকলেও তাকে ভরণ পোষণের সঙ্গতি না হয় তখন দেনমোহর হয় তার একমাত্র সম্বল ।

বিবাহের রেজিস্ট্রেশনঃ আইনের বিধানমতে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে তার লিখিত ডকুমেন্টের নাম রেজিস্ট্রেশন । রেজিস্ট্রেশনের কাজটি যার দফতরে সাধিত হয় আইন অনুসারে তার নাম নিকাহ রেজিস্টার ( Nikah Rejistrar ) , আমারা যাকে এতক্ষণ কাজী নামে ডেকেছি । রেজিস্ট্রেশন বিয়ের প্রামাণ্য দলিল । মুসলিম বিবাহ ও তালাক ( নিবন্ধীকরণ ) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত প্রত্যেকটি বিয়ে অবশ্যই এই আইনের বিধান অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করতে হবে । যদি কোন মৌলানা বা হুজুর দ্বারা বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় তবে বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিয়েটি রেজিস্ট্রি করাতে হবে। বিয়ে রেজিস্ট্রি করার দায়িত্ব স্বামীর ।উল্লেখ্য, স্বামী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে শাস্তি স্বরূপ ২ বছরের বিনাশ্রম কারাবাস অথবা ৩ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।


মুসলিম বিবাহ আইন pdf, মুসলিম আইনে বিবাহ, মুসলিম বিবাহ আইন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মুসলিম বিবাহ আইন, মুসলিম আইন বিবাহ,

Leave a Reply

Your email address will not be published.