যশোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

আজ আমি আপনাদের আমার যশোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু তথ্য জানাবো, তবে এর আগে আমার জেলা সম্পর্কে কিছু কথা বলি । যশোরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর যশোরের বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন আলী হোসেন মণি। উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জেলা যশোর অনেক কিছুর জন্য বিখ্যাত হলেও মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে আমাদের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সীমাহীন বীরত্ব প্রদর্শন করে। তাদের সম্মিলিত বীরত্বে এক ভয়াবহ যুদ্ধে দেশের প্রথম শত্রুর হাত থেকে আমাদের যশোর জেলা মুক্ত হয়। সেই অহংকারী গৌরবের দিন একাত্তরের ৭ ডিসেম্বর। তাই যশোরবাসী সর্বদাই মাথা উঁচু করে বলতে পারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যশোরই প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা। এটা আমাদের পরম গর্ব.

যশোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

যশোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

ইতিহাসঃ
যশোর একটি অতি প্রাচীন জনপদ। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে মিশরীয়রা ভৈরব নদের তীরে এক সমৃদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলে। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রীস্টাব্দের দিকে পীর খান জাহান আলী সহ বারজন আউলিয়া যশোরের মুড়লীতে ইসলাম ধর্ম প্রচারের প্রধান কেন্দ্র স্থাপন করেন। ক্রমে এ স্থানে মুড়লী কসবা নামে একটি নতুন শহর গড়ে উঠে। ১৫৫৫ খ্রীস্টাব্দের দিকে যশোর রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যশোর-খুলনা-বনগাঁ এবং কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরের অংশ বিশেষ যশোর রাজ্যের অন্তভুর্ক্ত ছিলো। ১৭৮১ খৃষ্টাব্দে যশোর একটি পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জেলা। ১৮৬৪ সালে গঠন করা হয় হয় যশোর পৌরসভা। ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দে যশোর জিলা স্কুল, ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, ১৯২০-৩০ এ যশোর বিমান বন্দর(দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটা ব্রিটিশ বিমান বাহিনির ঘাটি ছিল) এবং ১৮৯০ সালের দিকে কলকাতার সাথে যশোরের রেল-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্বাধীন হওয়া জেলাটি যশোর।

অর্থনীতিঃ
বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলার মধ্যে যশোর এমন একটি জেলা যেটি শুধু অর্থনীতিই নয় বরং বাংলাদেশের মাত্র ২টি জেলার মধ্যে একটি জেলা, যে জেলা সকল দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

বেনাপোল স্থল বন্দরঃ
যশোরের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেনাপোল স্থল বন্দর যা শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম বেনাপোলে অবস্থিত। ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের ৯৫% এর মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ওপারে আছে পেট্রাপোল। সরকারি আমদানী শুল্ক আহরণে বেনাপোল স্থল বন্দরটির ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। এখানকার মানুষের জীবিকার অন্যতম সূত্র বেনাপোল স্থল বন্দরের কাস্টমস্‌ ক্লিয়ারিং এজেন্টের কাজ।
অবিভক্ত ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জেলা যশোর অনেক কিছুর জন্যেই বিখ্যাত। বাংলাদেশের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে ২-জনই বৃহত্তর যশোর জেলার কৃতি সন্তান। এটা আমাদের যশোর বাসিদের জন্য পরম অহংকার। স্বাধীনতা যুদ্ধেও যশোরের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চুড়ান্তভাবে শেষ হবার কয়েকদিন আগেই স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণপন লড়াইয়ে দেশের সর্বপ্রথম শত্রু মুক্ত হয় এই যশোর জেলা। সেই গৌরবমন্ডিত তারিখটি ছিল ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর। তাই আমি চিরকাল মাথা উচুঁ করে বলতে পারি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যশোরই হল প্রথম শত্রু মুক্ত জেলা।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ (১৯৩৬-১৯৭১)
বর্তমান নড়াইল জেলার মহেষখালী গ্রামে ১৯৩৬ সালের ২৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-মরহুম আমানত শেখ ও মাতা-বেগম জেন্নাতা খানম। ৮ম শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় তিনি ১৯৫৬ সালে ইপিআর-এ ভর্তি হন। ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার ঝিকরগাছা-শার্শা সীমান্তে গোয়ালহাটী গ্রামে হানাদার বাহিনীর সাথে সস্মুখ যুদ্ধ করে শহীদ হন।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সেপাহী হামিদুর রহমান (১৯৫৩-১৯৭১)
বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার খোরদা-খালিশপুর গ্রামে ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জনাব আক্কাছ আলী মন্ডল, মাতা-বেগম কায়েদুন্নেছা। সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গলের ধলই সীমান্তে ২৮ অক্টোবর ১৯৭১ পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। আমবাসা গ্রামে তাঁকে সমাধি করা হয়।

(বিঃ দ্রঃ- ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত নড়াইল ও ঝিনাইদহ যশোর জেলার মহাকুমা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল, ১৯৮৬ শালে নড়াইল ও ঝিনাইদহ কে যশোর থেকে আলাদা করে নড়াইল ও ঝিনাইদহ কে স্বতন্ত্র জেলা হিসাবে ঘোষণা করে আইন পাশ হয় )

যশোরের মুক্তিযোদ্ধা

ডেট লাইন ৩ মার্চঃ

গণপরিষদের অধিবেশন আকস্মিকভাবে স্থগিত ঘোষণার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে যশোরবাসী। ৩ মার্চ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। যশোর জেলা জাসদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অশোক রায় জানান, ছাত্রদের ঐ মিছিলটি কালেক্টরেট ভবনের কাছে এসে পৌঁছালে ভবনের ছাদে উত্তোলিত পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলেন তরুণ ছাত্রনেতা আব্দুল হাই। বেলা ১১টার দিকে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে সেনা সদস্যদের দেখে উত্তেজিত ছাত্ররা তাদের ওপর ইটপাটকেল ছোঁড়ে। সেনা সদস্যরা তখন তাদের দিকে গুলিবর্ষণ করে। এতে এক্সচেঞ্জের অদূরে গোলপাতার ঘরে অবস্থানকারী মধ্যবয়সী নারী চারুবালা কর নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধে তিনিই যশোরের প্রথম শহীদ। বিকালে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নীলগঞ্জ শ্মশানে। এ সময় শহরের দড়াটানা থেকে নীলগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য।

উত্তাল মার্চ :-

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর স্বাধীনতাকামী যশোরবাসী পাক সেনাদের ঘাঁটি যশোর সেনানিবাসে রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে এবং ছাত্রনেতা হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে ‘জয়বাংলা বাহিনী’ মার্চপাস্ট করে। ২৫ মার্চ যশোর সেনানিবাস থেকে সেনা সদস্যরা শহরে ঢোকার সময় মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর গণপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মশিউর রহমানকে পাক বাহিনী শহরের সিভিল কোর্ট এলাকার বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। ৩০ মার্চ পাকসেনারা যশোর শহর ছেড়ে সেনানিবাসে ফিরে যায়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা ক্যান্টনমেন্টের চারদিক আরিফপুর, কাশিমপুর, খয়েরতলা, শানতলা জুড়ে অবস্থান নেয়। গ্রামের সাধারণ মানুষ ডাব, রুটি, চিড়া এনে মুক্তিযোদ্ধাদের আপ্যায়ন করে।

ওইদিনই (৩০ মার্চ) ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দীনের নেতৃত্বে যশোর সেনানিবাসের বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ৩১ মার্চ নড়াইল থেকে হাজার হাজার মানুষের জঙ্গি মিছিল আসে যশোরে। তারা শহরবাসীর সহায়তায় হামলা চালায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। মুক্তি পান সকল রাজবন্দী। যশোর ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। কমান্ডার ছিলেন মেজর মঞ্জুর। আর সেখানে পাক বাহিনীর ১০৭ নম্বর ব্রিগেড মোতায়েন ছিল। এর কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান। যশোর সেনানিবাস থেকে পাক বাহিনী ৬টি জেলা নিয়ন্ত্রণ করতো।

যশোর দুর্গের পতন :-৬ ডিসেম্বর সকালে ও দুপুরে দুই দফায় প্রচণ্ড লড়াই হয় ভারতীয় ৯ম পদাতিক ও ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশনের সাথে পাকিস্তানি ৯ম ডিভিশনের। সুরক্ষিত পাক দুর্গ বলে খ্যাত যশোর ক্যান্টনমেন্টে পর্যাপ্ত সৈন্য না থাকায় পাকিস্তানি সেনারা হতোদ্যম হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে থাকে। মুখোমুখি সে যুদ্ধে পাকসেনাদের অবস্থান ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্টের ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে আফরায়। বাংলাদেশের ৮ কিলোমিটার অভ্যন্তরে গরিবপুরে মিত্র বাহিনী অবস্থান নেয়। সীমান্তের ওপারে বয়রা থেকে দূরপাল্লার কামানের শেল এসে পড়ে যশোর ক্যান্টনমেন্ট, বিমান ঘাঁটিতে। আফরার প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ায় পাকসেনাদের পালানো ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। হৈবতপুর এবং আশপাশের গ্রামের মুক্তিকামী মানুষ পাকসেনাদের হত্যা করতে থাকে। এই যুদ্ধে ভারতীয় অন্তত একশ’ যোদ্ধা শহীদ হন। নিহত হয় বিপুল সংখ্যক পাকসেনা। শেষ পর্যন্ত পাক বাহিনী যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে খুলনায় পালিয়ে যায়। এভাবেই পতন ঘটে যশোর দুর্গের। ৬ ডিসেম্বর পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয় যশোর।

৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবসঃ

১৯৭১-এর এই দিনে বাংলাদেশের প্রথম জেলা হিসাবে যশোর জেলা সর্বপ্রথম পাক হানাদার মুক্ত হয়। বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত যশোরবাসী ৭ ডিসেম্বর সকালে নেমে আসে রাস্তায়। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মুখরিত করে তোলে চারদিক। ঘরে ঘরে ওড়ে লাল-সবুজ পতাকা। পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনে সারাদেশের মতো যশোরবাসীকেও দিতে হয়েছে চরম মূল্য। ঝরে গেছে অনেক তাজা প্রাণ।


যশোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যশোর জেলার মুক্তিযোদ্ধা, যশোরের মুক্তিযুদ্ধ, যশোর জেলার বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে যশোর জেলা, মুক্তিযুদ্ধে যশোর, যশোরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যশোরের মুক্তিযোদ্ধা,

Leave a Reply

Your email address will not be published.